নগর বার্তা

মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের আয়নায় আমাদের পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক -মিজানুর হক খান



মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের আয়নায় আমাদের পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক -মিজানুর হক খান

মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের আয়নায় আমাদের পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক

মিজানুর হক খান, সভাপতি

জার্মান আওয়ামী লীগ

২০২৪ সালের আগস্টের সেই তপ্ত বিকেল। এক জঙ্গী মব আছড়ে পড়ল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের সেই বাড়িটিতে, যা কেবল একটি দালান ছিল না, ছিল একটি জাতির জন্মের মহাকাব্য। যে বাড়িটি থেকে একদিন স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছিল, যে সিঁড়িতে বাংলার অবিসংবাদিত নেতার রক্ত মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল, সেই বাড়িটিই আগুনে পুড়ল, ভাঙচুর হলো। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হলো বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর চশমা, তাঁর প্রিয় পাইপ, তাঁর পড়ার ঘর—সবকিছু যখন ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল, তখন কি আমরা কেবল একটি বাড়ি হারাচ্ছিলাম? না, আমরা হারাচ্ছিলাম আমাদের আত্মপরিচয়ের শেষ আশ্রয়স্থল। এক গভীর বেদনায় মুহ্যমান হয়ে থমকে দাঁড়াল ইতিহাস। যে বাড়িটি ছিল আমাদের গর্বের প্রতীক, তাকে এভাবে ভূলুণ্ঠিত হতে দেখে স্তম্ভিত হলো বিশ্ববিবেক। ১৭ মার্চ তাঁর জন্মদিনে আজ যখন আমরা ফিরে তাকাই, তখন ধানমন্ডি ৩২-এর সেই পোড়া ক্ষত আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে—এ কোন প্রতিহিংসার পথে আমরা হাঁটছি?

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি ইউনুস সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ধ্বংস করবার পরেও, ইতিহাসের পাতা কিংবা আমাদের মন থেকে কি বাড়িটির আবেদন মুছে ফেলতে পেরেছে? ইউনুস সরকার বা বর্তমান বিএনপি সরকার পাঠ্যপুস্তকের পাতা থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম মুছে ফেলতে পেরেছে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটি বাঙ্গালী আজো আয়নায় তাকিয়ে দেখতে পায় - 

আকাশের ওপারে আকাশ,

তার ওপরে মেঘ,

মেঘের মধ্যে বাড়ি—

৩২ নম্বর মেঘমহল।

৩২ নম্বরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আপনি।

আপনার গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি,

চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা,

হাতে পাইপ। ছাদের কিনারে সানশেডে উড়ছে কবুতরগুলো।

উঠানে সাইকেল-রিকশা চালাচ্ছে লাল সোয়েটার পরা রাসেল।  

[আনিসুল হক, ‘৩২ নম্বর মেঘের ওপারে’]

হয়ত ‘কালো মোটা ফ্রেমের চশমায় পাইপ হাতে’ দাঁড়ানো বঙ্গবন্ধুকে দেখবার জন্যই স্বাধীনতা প্রেমী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা আজো কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার মধ্যেও অবৈধ আটকাদেশের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে প্রতিদিন পতাকা হাতে উপস্থিত হয়েছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে। অবৈধ সন্ত্রাস নিরোধ আইনের আওতায় দিনমজুর-রিকশাওয়ালা-ছাত্র-শিক্ষকদের হয়ত বন্দী করতে পেরেছে, কিন্তু কর্তৃত্ববাদী সরকার শত বাঁধা উপেক্ষা করেও ৩২ নম্বর মুখী মানুষের যাত্রা থামাতে পারেনি।   

 

ইতিহাসের নির্মাতা ও পথপ্রদর্শক

বাংলাদেশের মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সুদূরপ্রসারী। তোফায়েল আহমেদ তাঁর এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় উল্লেখ করেছেন কীভাবে বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ’ নামটির প্রবর্তন করেছিলেন। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, "আজ থেকে এই দেশের নাম হবে বাংলাদেশ।" (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, তোফায়েল আহমেদ)। এটি ছিল কেবল একটি ভৌগোলিক নামকরণ নয়, বরং হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক বৈপ্লবিক উচ্চারণ।

৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ যা আজ ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারের অংশ, তার গুরুত্ব আজও অম্লান, যতই পাঠ্যপুস্তক থেকে ইউনুস-বিএনপি সরকার সরিয়ে ফেলুক এই ভাষণ। সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা তার ‘৭ মার্চ: বঙ্গবন্ধু ও অসম্মানের রাজনীতি’ কলামে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে দেখিয়েছেন যে, ৭ মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির মুক্তির সনদ। তিনি লিখেছেন, যারা আজ বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চায়, তারা আসলে বাঙালির অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছে। (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা) ইশতিয়াক রেজার বক্তব্যের প্রতিফলনই যেন আমরা দেখলাম ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে। বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এই প্রথমবারের মত শতাধিক স্বাধীনতাবিরোধি বা তাদের পরিবারের সদস্যরা আজকে সংসদে বসেছে, সেই স্বাধীন দেশের সংসদ যার বিরোধিতা তারা করেছেন ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে কিংবা ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে পরিবারসহ হত্যা করবার মাধ্যমে। বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বলেই আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় থাকার পরেও স্বাধীনতাবিরোধী স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যা জাতি হিসেবে অত্যন্ত লজ্জার - ধিক্কার জানাই এই শোক প্রস্তাবের। 

একটি নতুন রাষ্ট্রের কারিগর: নীতি ও দর্শন

স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু যখন দেশ গড়ার কাজ শুরু করেন, তখন তাঁর সামনে ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ১৯৭২ সালের প্রথম বাজেট সম্পর্কে ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদ মিলে কীভাবে একটি শূন্য কোষাগার নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কৃষকের মুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ছিল তাঁর দর্শনের মূল কেন্দ্র। (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার)।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিস্ময়কর রকমের আধুনিক। সৈয়দ বদরুল আহসান তাঁর নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুর সেই বিখ্যাত উক্তি "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়" (Friendship to all, malice to none)-এর ওপর আলোকপাত করেছেন। এই নীতি আজও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হয়ে আছে। (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, সৈয়দ বদরুল আহসান) বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শান্তিপূর্ণ সুইজারল্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে। তাঁর এই নীতির সুফল আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শাসনামলে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পর থেকে এই নীতি না মানার ফলে বাংলাদেশ একটি ভূ-রাজনৈতিক ক্রাইসিসের মধ্যে পড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক দৈন্যদশার এই অন্যতম কারণ এই কূটনৈতিক অদূরদর্শিতা। ইউনুস সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক গোলামির চুক্তি স্বাক্ষর করে, ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার মাধ্যমে আবার প্রমানিত হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগ ভারতের সাথে দেশের স্বার্থের পরিপন্থি কোনো গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। ইউনুসের এই গোলামির চুক্তির কারণে আজকে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন হচ্ছে।  

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে এক অস্থির সময় পার করছে। এই সন্ধিক্ষণে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবন্ধু যে শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতা থেকে উত্তরণে সেই সাম্যের আদর্শই হতে পারে আমাদের রক্ষাকবচ। (সূত্র: প্রথম আলো, আবুল কাসেম ফজলুল হক)।

আজ যখন দেশের অখণ্ডতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। তিনি এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিলেন যেখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই বাঙালি হিসেবে পরিচিত হবে। বর্তমানের অসহিষ্ণু রাজনীতির বিপরীতে বঙ্গবন্ধুর সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক (inclusive) রাজনীতির চর্চা আজ সময়ের দাবি। দু:খের বিষয় হচ্ছে আজকের বাংলাদেশে কেউ নিরাপদ নয়। আগস্ট ২০২৪-এর পর সংঘটিত ৩০০০-এর বেশী সাম্প্রদায়িক ঘটনাই প্রমান করে বাংলাদেশের বর্তমান অসাম্প্রদায়িক অবস্থা।  

ধানমন্ডি ৩২-এর ধ্বংসযজ্ঞ: বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক আইন

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির সেই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও আজ পর্যন্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতির স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন—যা একটি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত ছিল—তা ধ্বংস করা কেবল জাতীয় অপরাধ নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইনেরও চরম লঙ্ঘন।

বাংলাদেশি দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860) এবং পুরাকীর্তি আইন (Antiquities Act, 1968) অনুযায়ী জাতীয় ঐতিহ্যের ক্ষতিসাধন একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এর বাইরেও আন্তর্জাতিক আইনে এর ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৫৪ সালের 'হগ কনভেনশন' (Hague Convention for the Protection of Cultural Property) অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় বা যেকোনো পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদিও এটি মূলত যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আইসিসি (International Criminal Court)-এর রোম সংবিধি অনুযায়ী, পদ্ধতিগতভাবে কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে তাদের ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করা 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে গণ্য হতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মুছে ফেলার এই প্রচেষ্টা আসলে একটি জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করার ষড়যন্ত্র। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা যেকোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল অবিলম্বে এই অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যদি চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোনো ইতিহাসই নিরাপদ থাকবে না।

বঙ্গবন্ধু: দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে এক রাষ্ট্রনায়ক

বঙ্গবন্ধুকে কোনো নির্দিষ্ট দলের ফ্রেমবন্দি করে রাখা তাঁর বিশালতাকে খাটো করার শামিল। হারুন-অর-রশীদ তাঁর এক কলামে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ—এই দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক। (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, হারুন-অর-রশীদ)। জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করে তিনি যেভাবে পাকিস্তান আমলে বাঙালির দাবি আদায়ে সোচ্চার ছিলেন, তা তাকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নেতা নয়, বরং সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের নেতায় পরিণত করেছে।

সামকাল পত্রিকার একটি নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুর শেষ কারাজীবনের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই মানুষটি তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, কেবল আমাদের আলোর মুখ দেখানোর জন্য। (সূত্র: সমকাল)। আজ যারা ক্ষমতার রদবদলের সুযোগে তাঁর ভাস্কর্য ভাঙছে বা তাঁর প্রতিকৃতিতে আঘাত হানছে, তারা আসলে নিজের শিকড়কেই কুঠারাঘাত করছে।

উপসংহার: জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। এই দিনটি আমাদের জন্য কেবল উৎসবের নয়, বরং আত্মোপলব্ধির। ধানমন্ডি ৩২-এর সেই ধ্বংসাবশেষ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। বঙ্গবন্ধু কোনো ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আদর্শ। পুড়িয়ে দিলেই বা ভেঙে দিলেই সেই আদর্শ শেষ হয়ে যায় না। তিনি হলেন কবি শামসুর রহমানের - 

“ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের উপর পাখা মেলে দেয়

জোত্‌স্নার সারস,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের উপর পতাকার মত 

দুলতে থাকে স্বাধীনতা,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে

মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।”

[শামসুর রহমানের ‘অবিরল জলভ্রমি’ কাব্যগ্রন্থ থেকে] 

আজকের বাংলাদেশে যখন গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার কথা বলা হচ্ছে, তখন মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ, যিনি সারাজীবন গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের জন্য লড়াই করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে। আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আমরা যদি একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর যোগ্য আসনে আসীন রেখেই তা করতে হবে। তাঁকে অস্বীকার করে যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তার গন্তব্য হবে অন্ধকার।

আসুন, এই জন্মদিনে আমরা অঙ্গীকার করি—আমরা আর কোনো ইতিহাস ধ্বংস হতে দেব না। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নকে স্বার্থপর রাজনীতি থেকে মুক্ত করে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করব। যে বাড়িটি আজ পুড়ে ছাই হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা যেন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসের প্রতিশোধ বড় ভয়ংকর। বঙ্গবন্ধু মরেও অমর, তিনি আমাদের হৃদয়ে, আমাদের অস্তিত্বে। তাঁর ভাষায় বলতে হয়, "আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না।"

তথ্যসূত্র ও উদ্ধৃতি:

১. সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, ‘৭ মার্চ: বঙ্গবন্ধু ও অসম্মানের রাজনীতি’, বাংলা ট্রিবিউন।

২. তোফায়েল আহমেদ, ‘বঙ্গবন্ধু দ্য নেমসেক বাংলাদেশ’, দ্য ডেইলি স্টার।

৩. সৈয়দ বদরুল আহসান, ‘বঙ্গবন্ধু: দ্য আর্কিটেক্ট অব বাংলাদেশ’স ফরেন পলিসি’, দ্য ডেইলি স্টার।

৪. আবুল কাসেম ফজলুল হক, ‘বঙ্গবন্ধু যে সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন’, প্রথম আলো।

৫. হারুন-অর-রশীদ, ‘বঙ্গবন্ধু অ্যান্ড দ্য ফ্রিডম অব বাংলাদেশ’, দ্য ডেইলি স্টার।

৬. ‘স্বাধীন দেশের আকাশে প্রথম যা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু’, বাংলা ট্রিবিউন।

৭. ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আদর্শ’, সমকাল।

আপনার মতামত লিখুন

নগর বার্তা

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬


মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের আয়নায় আমাদের পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক -মিজানুর হক খান

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মার্চ ২০২৬

featured Image

মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের আয়নায় আমাদের পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক

মিজানুর হক খান, সভাপতি

জার্মান আওয়ামী লীগ


২০২৪ সালের আগস্টের সেই তপ্ত বিকেল। এক জঙ্গী মব আছড়ে পড়ল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের সেই বাড়িটিতে, যা কেবল একটি দালান ছিল না, ছিল একটি জাতির জন্মের মহাকাব্য। যে বাড়িটি থেকে একদিন স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছিল, যে সিঁড়িতে বাংলার অবিসংবাদিত নেতার রক্ত মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল, সেই বাড়িটিই আগুনে পুড়ল, ভাঙচুর হলো। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হলো বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর চশমা, তাঁর প্রিয় পাইপ, তাঁর পড়ার ঘর—সবকিছু যখন ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল, তখন কি আমরা কেবল একটি বাড়ি হারাচ্ছিলাম? না, আমরা হারাচ্ছিলাম আমাদের আত্মপরিচয়ের শেষ আশ্রয়স্থল। এক গভীর বেদনায় মুহ্যমান হয়ে থমকে দাঁড়াল ইতিহাস। যে বাড়িটি ছিল আমাদের গর্বের প্রতীক, তাকে এভাবে ভূলুণ্ঠিত হতে দেখে স্তম্ভিত হলো বিশ্ববিবেক। ১৭ মার্চ তাঁর জন্মদিনে আজ যখন আমরা ফিরে তাকাই, তখন ধানমন্ডি ৩২-এর সেই পোড়া ক্ষত আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে—এ কোন প্রতিহিংসার পথে আমরা হাঁটছি?

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি ইউনুস সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ধ্বংস করবার পরেও, ইতিহাসের পাতা কিংবা আমাদের মন থেকে কি বাড়িটির আবেদন মুছে ফেলতে পেরেছে? ইউনুস সরকার বা বর্তমান বিএনপি সরকার পাঠ্যপুস্তকের পাতা থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম মুছে ফেলতে পেরেছে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটি বাঙ্গালী আজো আয়নায় তাকিয়ে দেখতে পায় - 

আকাশের ওপারে আকাশ,

তার ওপরে মেঘ,

মেঘের মধ্যে বাড়ি—

৩২ নম্বর মেঘমহল।

৩২ নম্বরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আপনি।

আপনার গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি,

চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা,

হাতে পাইপ। ছাদের কিনারে সানশেডে উড়ছে কবুতরগুলো।

উঠানে সাইকেল-রিকশা চালাচ্ছে লাল সোয়েটার পরা রাসেল।  

[আনিসুল হক, ‘৩২ নম্বর মেঘের ওপারে’]

হয়ত ‘কালো মোটা ফ্রেমের চশমায় পাইপ হাতে’ দাঁড়ানো বঙ্গবন্ধুকে দেখবার জন্যই স্বাধীনতা প্রেমী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা আজো কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার মধ্যেও অবৈধ আটকাদেশের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে প্রতিদিন পতাকা হাতে উপস্থিত হয়েছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে। অবৈধ সন্ত্রাস নিরোধ আইনের আওতায় দিনমজুর-রিকশাওয়ালা-ছাত্র-শিক্ষকদের হয়ত বন্দী করতে পেরেছে, কিন্তু কর্তৃত্ববাদী সরকার শত বাঁধা উপেক্ষা করেও ৩২ নম্বর মুখী মানুষের যাত্রা থামাতে পারেনি।   

 

ইতিহাসের নির্মাতা ও পথপ্রদর্শক

বাংলাদেশের মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সুদূরপ্রসারী। তোফায়েল আহমেদ তাঁর এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় উল্লেখ করেছেন কীভাবে বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ’ নামটির প্রবর্তন করেছিলেন। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, "আজ থেকে এই দেশের নাম হবে বাংলাদেশ।" (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, তোফায়েল আহমেদ)। এটি ছিল কেবল একটি ভৌগোলিক নামকরণ নয়, বরং হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক বৈপ্লবিক উচ্চারণ।

৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ যা আজ ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারের অংশ, তার গুরুত্ব আজও অম্লান, যতই পাঠ্যপুস্তক থেকে ইউনুস-বিএনপি সরকার সরিয়ে ফেলুক এই ভাষণ। সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা তার ‘৭ মার্চ: বঙ্গবন্ধু ও অসম্মানের রাজনীতি’ কলামে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে দেখিয়েছেন যে, ৭ মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির মুক্তির সনদ। তিনি লিখেছেন, যারা আজ বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চায়, তারা আসলে বাঙালির অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছে। (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা) ইশতিয়াক রেজার বক্তব্যের প্রতিফলনই যেন আমরা দেখলাম ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে। বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এই প্রথমবারের মত শতাধিক স্বাধীনতাবিরোধি বা তাদের পরিবারের সদস্যরা আজকে সংসদে বসেছে, সেই স্বাধীন দেশের সংসদ যার বিরোধিতা তারা করেছেন ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে কিংবা ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে পরিবারসহ হত্যা করবার মাধ্যমে। বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বলেই আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় থাকার পরেও স্বাধীনতাবিরোধী স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যা জাতি হিসেবে অত্যন্ত লজ্জার - ধিক্কার জানাই এই শোক প্রস্তাবের। 

একটি নতুন রাষ্ট্রের কারিগর: নীতি ও দর্শন

স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু যখন দেশ গড়ার কাজ শুরু করেন, তখন তাঁর সামনে ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ১৯৭২ সালের প্রথম বাজেট সম্পর্কে ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদ মিলে কীভাবে একটি শূন্য কোষাগার নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কৃষকের মুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ছিল তাঁর দর্শনের মূল কেন্দ্র। (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার)।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিস্ময়কর রকমের আধুনিক। সৈয়দ বদরুল আহসান তাঁর নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুর সেই বিখ্যাত উক্তি "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়" (Friendship to all, malice to none)-এর ওপর আলোকপাত করেছেন। এই নীতি আজও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হয়ে আছে। (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, সৈয়দ বদরুল আহসান) বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শান্তিপূর্ণ সুইজারল্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে। তাঁর এই নীতির সুফল আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শাসনামলে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পর থেকে এই নীতি না মানার ফলে বাংলাদেশ একটি ভূ-রাজনৈতিক ক্রাইসিসের মধ্যে পড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক দৈন্যদশার এই অন্যতম কারণ এই কূটনৈতিক অদূরদর্শিতা। ইউনুস সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক গোলামির চুক্তি স্বাক্ষর করে, ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার মাধ্যমে আবার প্রমানিত হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগ ভারতের সাথে দেশের স্বার্থের পরিপন্থি কোনো গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। ইউনুসের এই গোলামির চুক্তির কারণে আজকে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন হচ্ছে।  

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে এক অস্থির সময় পার করছে। এই সন্ধিক্ষণে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবন্ধু যে শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতা থেকে উত্তরণে সেই সাম্যের আদর্শই হতে পারে আমাদের রক্ষাকবচ। (সূত্র: প্রথম আলো, আবুল কাসেম ফজলুল হক)।

আজ যখন দেশের অখণ্ডতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। তিনি এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিলেন যেখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই বাঙালি হিসেবে পরিচিত হবে। বর্তমানের অসহিষ্ণু রাজনীতির বিপরীতে বঙ্গবন্ধুর সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক (inclusive) রাজনীতির চর্চা আজ সময়ের দাবি। দু:খের বিষয় হচ্ছে আজকের বাংলাদেশে কেউ নিরাপদ নয়। আগস্ট ২০২৪-এর পর সংঘটিত ৩০০০-এর বেশী সাম্প্রদায়িক ঘটনাই প্রমান করে বাংলাদেশের বর্তমান অসাম্প্রদায়িক অবস্থা।  

ধানমন্ডি ৩২-এর ধ্বংসযজ্ঞ: বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক আইন

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির সেই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও আজ পর্যন্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতির স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন—যা একটি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত ছিল—তা ধ্বংস করা কেবল জাতীয় অপরাধ নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইনেরও চরম লঙ্ঘন।

বাংলাদেশি দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860) এবং পুরাকীর্তি আইন (Antiquities Act, 1968) অনুযায়ী জাতীয় ঐতিহ্যের ক্ষতিসাধন একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এর বাইরেও আন্তর্জাতিক আইনে এর ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৫৪ সালের 'হগ কনভেনশন' (Hague Convention for the Protection of Cultural Property) অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় বা যেকোনো পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদিও এটি মূলত যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আইসিসি (International Criminal Court)-এর রোম সংবিধি অনুযায়ী, পদ্ধতিগতভাবে কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে তাদের ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করা 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে গণ্য হতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মুছে ফেলার এই প্রচেষ্টা আসলে একটি জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করার ষড়যন্ত্র। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা যেকোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল অবিলম্বে এই অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যদি চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোনো ইতিহাসই নিরাপদ থাকবে না।

বঙ্গবন্ধু: দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে এক রাষ্ট্রনায়ক

বঙ্গবন্ধুকে কোনো নির্দিষ্ট দলের ফ্রেমবন্দি করে রাখা তাঁর বিশালতাকে খাটো করার শামিল। হারুন-অর-রশীদ তাঁর এক কলামে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ—এই দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক। (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, হারুন-অর-রশীদ)। জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করে তিনি যেভাবে পাকিস্তান আমলে বাঙালির দাবি আদায়ে সোচ্চার ছিলেন, তা তাকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নেতা নয়, বরং সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের নেতায় পরিণত করেছে।

সামকাল পত্রিকার একটি নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুর শেষ কারাজীবনের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই মানুষটি তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, কেবল আমাদের আলোর মুখ দেখানোর জন্য। (সূত্র: সমকাল)। আজ যারা ক্ষমতার রদবদলের সুযোগে তাঁর ভাস্কর্য ভাঙছে বা তাঁর প্রতিকৃতিতে আঘাত হানছে, তারা আসলে নিজের শিকড়কেই কুঠারাঘাত করছে।

উপসংহার: জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। এই দিনটি আমাদের জন্য কেবল উৎসবের নয়, বরং আত্মোপলব্ধির। ধানমন্ডি ৩২-এর সেই ধ্বংসাবশেষ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। বঙ্গবন্ধু কোনো ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আদর্শ। পুড়িয়ে দিলেই বা ভেঙে দিলেই সেই আদর্শ শেষ হয়ে যায় না। তিনি হলেন কবি শামসুর রহমানের - 

“ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের উপর পাখা মেলে দেয়

জোত্‌স্নার সারস,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের উপর পতাকার মত 

দুলতে থাকে স্বাধীনতা,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে

মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।”

[শামসুর রহমানের ‘অবিরল জলভ্রমি’ কাব্যগ্রন্থ থেকে] 


আজকের বাংলাদেশে যখন গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার কথা বলা হচ্ছে, তখন মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ, যিনি সারাজীবন গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের জন্য লড়াই করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে। আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আমরা যদি একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর যোগ্য আসনে আসীন রেখেই তা করতে হবে। তাঁকে অস্বীকার করে যে যাত্রা শুরু হয়েছে, তার গন্তব্য হবে অন্ধকার।

আসুন, এই জন্মদিনে আমরা অঙ্গীকার করি—আমরা আর কোনো ইতিহাস ধ্বংস হতে দেব না। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নকে স্বার্থপর রাজনীতি থেকে মুক্ত করে জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করব। যে বাড়িটি আজ পুড়ে ছাই হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা যেন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসের প্রতিশোধ বড় ভয়ংকর। বঙ্গবন্ধু মরেও অমর, তিনি আমাদের হৃদয়ে, আমাদের অস্তিত্বে। তাঁর ভাষায় বলতে হয়, "আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না।"


তথ্যসূত্র ও উদ্ধৃতি:

১. সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, ‘৭ মার্চ: বঙ্গবন্ধু ও অসম্মানের রাজনীতি’, বাংলা ট্রিবিউন।

২. তোফায়েল আহমেদ, ‘বঙ্গবন্ধু দ্য নেমসেক বাংলাদেশ’, দ্য ডেইলি স্টার।

৩. সৈয়দ বদরুল আহসান, ‘বঙ্গবন্ধু: দ্য আর্কিটেক্ট অব বাংলাদেশ’স ফরেন পলিসি’, দ্য ডেইলি স্টার।

৪. আবুল কাসেম ফজলুল হক, ‘বঙ্গবন্ধু যে সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন’, প্রথম আলো।

৫. হারুন-অর-রশীদ, ‘বঙ্গবন্ধু অ্যান্ড দ্য ফ্রিডম অব বাংলাদেশ’, দ্য ডেইলি স্টার।

৬. ‘স্বাধীন দেশের আকাশে প্রথম যা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু’, বাংলা ট্রিবিউন।

৭. ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আদর্শ’, সমকাল।




নগর বার্তা

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ এইচ এম মামুন
কপিরাইট © ২০২৬ নগর বার্তা । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত