ঢাকা   শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
Nagorbarta

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও অপরাজনীতির কালিমা

গতকালের পর আজ বেদনাবিধুর ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে হত্যা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সপরিবারে তিনি নিহত হয়েছিলেন। বিদেশে ছিলেন বলে বেঁচে গিয়েছিলেন তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। যদিও বলা হয়ে থাকে, কয়েকজন বিপথগামী সেনাসদস্য হত্যা করেছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে দেশি-বিদেশি আর কারা যুক্ত ছিল, তা নিয়ে বহুদিন আরও গবেষণা হবে। কারণ, বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট। গতকাল আমরা চারজন রাজনৈতিক নেতার হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। ধারাবাহিকভাবে এগোলে এরপর সালভাদর আয়েন্দের কথাই আসে। কিন্তু আজকের এই দিনটিতে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া সেই মর্মন্তুদ ঘটনাটির মধ্যেই। পরে অন্যান্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করব। কে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের নির্মোহ ইতিহাস কীভাবে তাঁর মূল্যায়ন করে, সে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গোয়েবলসীয় ধারায় কখনো কখনো বারবার মিথ্যে কথা বলে তা সত্য হিসেবে কিছু সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত করা যায় বটে, কিন্তু শেষ বিচারে সেই মিথ্যা ধোপে টেকে না। নইলে হিটলারের জার্মানি যে প্রচণ্ড ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে নীল রক্তের আরাধনা করেছিল, সেটাই টিকে যেত। সময়ের পরিবর্তনে সত্য ও ন্যায় ফিরে আসে তার নির্দিষ্ট জায়গায়। ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের বিশাল ক্যানভাসে আঁকা বাংলাদেশের ছবিটি উজ্জ্বল করে তোলার পেছনে তিনিই ছিলেন মূল কারিগর। এই সত্যকে গোয়েবলসীয় ধারায় ম্লান করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কখনো কখনো কেউ কেউ শেখ মুজিবুর রহমানকে খাটো করার অভিপ্রায়ে নানা প্রশ্ন এনে হাজির করেন। ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত এতটাই মজবুত যে, সেসব অসার তথ্য দিয়ে তাঁকে নস্যাৎ করা যায় না। ২. বিভিন্নজনের কথা থেকে আমরা শেখ মুজিবকে বোঝার চেষ্টা করব। কোন মানুষটাকে হত্যা করেছিল নৃশংস বর্বররা, সেটা এই আলোচনা থেকে বোঝা যাবে। প্রথমেই আহমদ ছফার মূল্যায়ন। আহমদ ছফাকে তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রুও বঙ্গবন্ধুপ্রেমী বলবেন না। বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি ইতিহাস বিচার করেছেন। সেই বিচারে শেখ মুজিব বা আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা আছে। তবে ইতিহাসে শেখ মুজিব চরিত্রটির ব্যাপারে ছফা লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিবুর রহমান একটি যমজ শব্দ। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটার অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। যারা এই সত্য অস্বীকার করবে, তাদের সঙ্গে কোনো রকমের বিতর্ক, বাদ-প্রতিবাদ করতেও আমরা রাজি হব না।’ বাংলাদেশে শুধু নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মনীষীরা শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বলতে গেলে বাংলার মুক্তিসংগ্রামের প্রাণপুরুষ হিসেবেই অভিহিত করে থাকেন।  ভুল শোনেননি। এটা আহমদ ছফারই কথা। আরও একটু শুনুন, নইলে এই কথার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বোঝা কঠিন হবে। ছফা আরও লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে শেখ মুজিবের নাম এমন অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে, যত পণ্ডিত হোন না কেন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের নিপুণতা এবং যুক্তির মারপ্যাঁচ দেখিয়ে কোনো ব্যক্তি একটা থেকে আর একটাকে পৃথক করতে পারবেন না।’ এটুকু বলার পর ছফা বিষয়টির গভীরতা মাপার চেষ্টা করেন এইভাবে, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকাকে স্বাধীনতাসংগ্রামের সময়কালীন অন্য দশটা রাজনৈতিক দলের ভূমিকার সঙ্গে অবশ্যই তুলনামূলক মানদণ্ড প্রয়োগ করে বিচার করতে হবে। বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের চাইতে প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক নেতা হয়তো ছিলেন, তার চাইতে মেধাবী রাজনৈতিক নেতারও হয়তো অভাব ছিল না, জাতির সবচেয়ে নির্যাতিত অংশের সংগ্রামে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো নেতাও এ দেশে ছিলেন না, এই কথা বললে সত্য বলা হবে না। ‘কিন্তু একটি জাতি অন্তস্থ সত্তা, প্রাণ-পাতালের উত্তাপে আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করার তাগিদে বাংলার ইতিহাসের স্মরণকালের সবচাইতে মহত্তম ও ব্যাপক জনযুদ্ধটিতে যখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তার বেগ আবেগ সবটুকু ধারণ করেছিলেন শেখ মুজিব, আর কেউ নন।’ অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ সালাহউদ্দীন আহমদ লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি আমাদের বাঙালি জাতিসত্তাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়া হঠাৎ করে হয়নি। বাঙালির দীর্ঘদিনের আত্মানুসন্ধান, দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সংগ্রামের অমোঘ পরিণতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। আজ এ কথা ভেবে বিস্মিত হই যে এই ভূখণ্ড যেটি পাকিস্তান সৃষ্টির পর ‘পূর্ব বাংলা’ এবং ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে পরিচিত ছিল, সেটিকে ‘বাংলাদেশ’ বলে ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই জাঁদরেল পাকিস্তানি সমরনায়কদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে।’ অধ্যাপক রেহমান সোবহান লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর যে ভয়াবহ নৃশংসতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সারা বিশ্ব তা লক্ষ করেছে। তাই বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের নেতা এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতে সময় লাগেনি। ১৯৭১-এর পর বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়ে যে যা-ই বলুক না কেন, সব বাংলাদেশিকে অন্তত এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে বঙ্গবন্ধু যদি এ দেশের মানুষের মধ্যে জাতীয় চেতনা ও আত্মসচেতনতা না জাগাতে পারতেন (বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের আগে) এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে তিনি যদি বিশ্বের সামনে প্রস্তাব উত্থাপন না করতেন, তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হতো আরও বিলম্বিত এবং দীর্ঘায়িত একটি প্রক্রিয়া।’ অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মূল্যায়ন: বঙ্গবন্ধুর যে কীর্তি সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে—বাঙালি জাতির জন্য এই জাতিরাষ্ট্র গঠনে স্বপ্ন ও সেই কীর্তির প্রসঙ্গটাই চলে গেছে অনেক তুচ্ছ ও অপ্রাসঙ্গিক বিতর্কের আড়ালে। ইতালির জন্য যে কাজ করেছিলেন কাভুর, মাৎসিনি, গ্যারিবল্ডি; জার্মানির জন্য যে কাজ করেছিলেন বিসমার্ক, সে হলো একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাতি হিসেবে সংগঠিত হওয়ার ও সেই সূত্রে একটি জাতিরাষ্ট্র গড়ার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। ইতিহাসের মহানায়কেরাই এই মহাকর্ম করেছেন। শেখ মুজিব তাঁদেরই একজন। এই উপমহাদেশে বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্র, একটি সুস্পষ্ট চারিত্র্যলক্ষণে বিশিষ্ট জনগোষ্ঠী যার রাষ্ট্রীয় বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বুনিয়াদ অপর রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি দৃঢ়। এর মধ্যে এই সম্ভাব্য জাতি গঠনের সম্ভাবনাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগিয়ে তিনি যে জাতীয় ঐক্যের ও রাষ্ট্রের পথ তৈরি করে গেলেন, সেটাই তাঁর কীর্তি, সেখানেই তিনি ইতিহাসের মহানায়ক।’ ৩. বাংলাদেশে শুধু নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মনীষীরা শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বলতে গেলে বাংলার মুক্তিসংগ্রামের প্রাণপুরুষ হিসেবেই অভিহিত করে থাকেন। ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি নিয়ে রুশ ভাষায় লিখিত দুটি বই যখন পড়েছি, তখন সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানকেই বলা হয়েছে এই সংগ্রামের মূল নায়ক। ‘বাংলার ডায়েরি’ নামের বইটি লিখেছেন রাশিয়ার কেন্দ্রীয় টেলিভিশনের তৎকালীন ভারত প্রতিনিধি বরিস কালিয়াগিন ও ইজভেস্তিয়া পত্রিকার প্রতিনিধি ভ্লাদিমির স্কোসিরোভ। দ্বিতীয় বইটির লেখক আলেকসান্দর ফিলিপোভ। তিনি ছিলেন পাকিস্তানে প্রাভদা পত্রিকার বিশেষ প্রতিবেদক। বইটির নাম বাংলা অনুবাদে, ‘অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে’। দুটি বই-ই আমাদের দেশের ইতিহাস রচনার জন্য তথ্যের খোরাক জোগাতে পারে। বই দুটির অনুবাদ হওয়া উচিত। ২৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি নিউজে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছিল। যে কেউ ইউটিউবে সেই তথ্য পেয়ে যাবেন। আর ১৯৭১ সালে বছরজুড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকা বাংলাদেশের যুদ্ধ নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেগুলো পড়ে দেখলেও মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল নায়ককে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না। ৪. ১৯৬৬ সালের ৬ দফার মাধ্যমেই মূলত জাতীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন শেখ মুজিব। আহমদ ছফার মতো আমরাও বলব, তাঁর চেয়েও প্রতিভাধর বহু রাজনীতিবিদ ছিলেন বাংলায়, কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের তখত্‌-তাউস কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব ছিল কেবলই শেখ মুজিবুর রহমানের। অসীম সাহস আর ক্ষমতাধরদের চ্যালেঞ্জ করার অপরিসীম ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর। এ কারণেই দেশের মানুষ তাদের নেতা নির্দিষ্ট করতে ভুল করেনি। স্বাধীনতার পর কত ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু দেশ চালাচ্ছিলেন, তা নিয়ে গবেষণা আজও শেষ হয়নি। তিনি কেন তাঁর ভাষণে বলতেন, ‘চাটার দল সব চেটে খেল’, সে কথা বুঝতে হলে সেই অসময় ও পরিপ্রেক্ষিতও বুঝতে হবে। যেকোনো মানুষের মতো তিনিও ভুল করেছেন। সেই ভুলের সমালোচনাও করা হয়। কিন্তু ঠিক ও ভুলকে বিশ্লেষণ করতে বসলে কোন দিকটা হেলে পড়বে, সেটা বুঝতে হলে ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণ করতে হবে। এবং তখন দেখা যাবে, চাইলেই শেখ মুজিবুর রহমানকে নাকচ করে দেওয়ার কোনো পথ খোলা নেই। কারণ, বাঙালিদের জন্য বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার জন্য শেখ মুজিব যে দীর্ঘ পথটি বেছে নিয়েছিলেন, সেই পথটিই তাঁকে অমর করে রাখবে। হত্যার রাজনীতি, লাশের রাজনীতি কোনো রাজনীতি নয়। উগ্রতা, হানাহানি, রক্তপাত কোনো শান্তির ঠিকানা দিতে পারে না। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার যে সুযোগগুলো আমাদের দেশে এসেছে, তা বারবার আমরা হাতছাড়া করেছি। শ্রদ্ধেয় মানুষদের অসম্মান করা হয়েছে। নিজের শিকড়কে অবহেলা করে অন্যের গুণগান বর্ণনা করা হয়েছে। বারবার দিগ্‌ভ্রান্ত হয়েছে দেশ। আমরা কি এই ঘৃণা ও অসম্মানের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় বীরদের সম্মান করতে শিখব না? ৫৫ বছর গেল, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বপ্ন দেখতে দেখতে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে বারবার। মুক্তিযুদ্ধকে সম্মান করা এবং মুক্তিযুদ্ধের নায়কদের অবনত মস্তকে সম্মান করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ স্বপ্নের দেশে পরিণত হওয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপটি রাখতে পারে। (শেষ) লেখক: উপসম্পাদক, আজকের পত্রিকা

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও অপরাজনীতির কালিমা